শবে কদর, যা লায়লাতুল কদর নামেও পরিচিত, ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বরকতময় রাতগুলির মধ্যে একটি। এ রাতে আল্লাহর অসীম রহমত ও মাগফেরাতের দরজা খোলা থাকে এবং এ রাতে ইবাদত করাকে হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম ঘোষণা করা হয়েছে।
শবে কদর বা শব-ই-কদর কি?
শবে কদর মানে “সম্মানিত রাত” বা “ভাগ্যের রাত”। ইসলামের পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতের মধ্যে এটি একটি বিশেষ রাত, যেখানে কুরআন নাজিল হয়েছে এবং এই রাতটিকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
Also Read
কুরআনে বলা হয়েছে:
“লায়লাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (সূরা কদর, আয়াত ৩)
শবে কদর কখন হয়?
যদিও শবে কদরের সঠিক তারিখ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে, নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: “রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদরের সন্ধান করুন।” (বুখারী ও মুসলিম)
এটি সাধারণত রমজানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯ তম রাতের মধ্যে ঘটে, তবে অনেকে ২৭ তম রাতটিকে বেশি সম্ভাব্য বলে মনে করেন।
শবে কদরের রাতের বৈশিষ্ট্য
- হাজার মাসের চেয়ে উত্তম- এই রাতে ইবাদতের সওয়াব ৮৩ বছরের ইবাদতের সমান।
- ফেরেশতাদের আগমন- ফেরেশতারা আল্লাহর বিশেষ রহমতে পৃথিবীতে আসেন।
- কুরআন নাযিলের রাত – এই রাতে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন অবতীর্ণ হয়।
- শান্তির রাত – এই রাত ভোর পর্যন্ত বরকতময় এবং শান্তিময়।
- গুনাহ মাফের সুযোগ- আল্লাহ ইবাদতকারীদের অতীতের গুনাহ মাফ করে দেন।
শবে কদরের রাতের ফজিলত
- কুরআনের ঘোষণার মাধ্যমে ফজিলত –আল্লাহ রাত্রির মর্যাদা ব্যাখ্যা করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা অবতীর্ণ করেছেন, যা সূরা আল কদর। এটা বলে: “এই রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (সূরা কদর, আয়াত ৩)
- হাদিসে শবে কদরের গুরুত্ব- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:”যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদত করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।”(বুখারী ও মুসলিম)
শবে কদরের নামাজ ও বিশেষ আমল
১. শবে কদরের বিশেষ প্রার্থনা
কদরের রাতে বেশি বেশি নামায পড়া উত্তম। সাধারণত দুই রাকাতে নামায পড়া হয় এবং প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পড়া যায়।
২. শব-ই-কদরের জন্য দুআ
রাসুলুল্লাহ (সা.) শবে কদরের রাতে এই দোয়াটি পাঠ করতে শিখিয়েছেন: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফুয়া ফা’ফু আন্নি
অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা পছন্দ করেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।” (তিরমিযী)
৩. কুরআন তেলাওয়াত করা
শবে-কদরের সর্বোত্তম আমলের মধ্যে একটি হল কুরআন তিলাওয়াত। এ রাতে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
৪. দুআ এবং ইস্তিগফার
শবে-কদরের রাতে, নিজের, নিজের পরিবার এবং সমস্ত মুসলমানদের জন্য ক্ষমা, রহমত এবং জান্নাতের প্রার্থনা করা উচিত।
৫. নফল ইবাদত ও দান
- জিকর ও তাসবিহ – সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বেশি বেশি পাঠ করা উচিত।
- গরীবদের সাহায্য করা – সাদাকাহ বা দান করা শব-ই-কদরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।
শবে কদর এবং কুরআন নাযিল
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই আমি লাইলাতুল কদরে কুরআন নাযিল করেছি।” (সূরা আল-কদর, আয়াত 1) এই রাতেই কুরআনের প্রথম নাজিল হয়, যা মানবজাতির জন্য এক বিরাট নিয়ামত।
শবে কদর এবং আল্লাহর রহমত
শবে কদরের রাতে আল্লাহর রহমতের দরজা খোলা থাকে, ফেরেশতাগণ দোয়া কবুলের জন্য অবতরণ করেন। যারা এ রাতে ইবাদত করে আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তি দেন।
শবে কদরের উপকারিতা
- গুনাহ মাফ করা হয় – শবে কদরে ইবাদত অতীতের পাপ মোচন করে।
- বিনিময়ে জান্নাত লাভ – এই রাতে আমল করা জান্নাতের পথকে সহজ করে দেয়।
- আল্লাহর রহমত ও আশীর্বাদ – আপনি যদি এই রাতে প্রার্থনা করেন তবে আল্লাহ আপনার প্রার্থনা কবুল করেন।
- দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ – শবে কদরের ইবাদত দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি আনে।
শবে কদর শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি
- রাতের ইবাদতের জন্য প্রস্তুতি নিন – রমজানের শেষ দশ দিনে আরও বিশ্রাম নিন যাতে আপনি জেগে থাকতে পারেন এবং শব-ই-কদরে ইবাদত করতে পারেন।
- সজাগ এবং মনোযোগী হোন – মনোযোগ সহকারে প্রার্থনা করুন, মহিমান্বিত করুন এবং উপাসনা করুন।
- নম্রতা এবং আন্তরিকতা বজায় রাখুন – শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করুন।
শবে কদরের বিশেষ ফজিলত ও আমল-শেষ কথা
শবে কদর এমন একটি রাত যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যারা এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে জানেন তাদের উচিত ইবাদত, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত ও তওবা করে যথাযথভাবে অতিবাহিত করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই পবিত্র রাতে সঠিকভাবে ইবাদত করার তৌফিক দান করুন এবং তাঁর রহমত ও ক্ষমা লাভের সুযোগ দান করুন। আমীন।